একসময় মানুষ দেখা করত।
মানে সত্যিকারের দেখা। মুখোমুখি। চোখে চোখ রেখে। কেউ কেউ আবার হাতও ধরত। সেটা অবশ্য আলাদা গল্প।
পাড়ার কাকু বিকেলে আসতেন। চা খেতেন। গল্প করতেন। দুই ঘণ্টা বসতেন। যাওয়ার সময় বলতেন, “আসি তাহলে।” তারপর দরজায় দাঁড়িয়ে আরো এক ঘণ্টা কথা বলতেন।
যোগাযোগ মানে তখন সত্যিই যোগাযোগ ছিল।
তারপর এলো চিঠি।
“প্রিয় অমুক, তোমার চিঠি পেয়ে মন ভরে গেল।”
চিঠি লিখতে বসলে মানুষ ভাবত। কী লিখব? কীভাবে লিখব? মনের কথা গুছিয়ে লিখত। কারণ একবার পাঠালে আর ফেরত আসবে না।
মুছে ফেলার বোতাম ছিল না। আনসেন্ড ছিল না।
ভুল করলে নতুন কাগজ। আর কাগজ কিনতে হত পয়সা দিয়ে — তাই ভাবনাচিন্তা করেই লিখত।
সেই চিঠি হাতে পেলে মানুষ বুকে জড়িয়ে ধরত। বারবার পড়ত। সিন্দুকে তুলে রাখত।
আজ কেউ স্ক্রিনশট তুলে রাখে। তারপর ফোন বদলালে সব শেষ।
তারপর এলো ইমেইল।
যোগাযোগ দ্রুত হলো। চিঠির দিন শেষ।
কিন্তু ইমেইলে একটা সমস্যা হলো — মানুষ লিখতে শুরু করল “অ্যাজ পার মাই লাস্ট ইমেইল” আর “প্লিজ ফাইন্ড অ্যাটাচড।”
ভালোবাসা গেল, অফিসের ভাষা এলো।
এখন মা ছেলেকে ইমেইল করেন — সাবজেক্ট: জানাও — রাতে ভাত খাবে কিনা।
তারপর এলো অর্কুট।
বাংলাদেশ আর ভারত একসাথে আবিষ্কার করল — আরে, অপরিচিত মানুষের সাথেও কথা বলা যায়!
স্ক্র্যাপবুকে লিখত, “কী করছ?”
উত্তর আসত তিনদিন পর, “ভালো, তুমি?”
সেই তিনদিন অপেক্ষার মধ্যে একটা রোমান্টিক যন্ত্রণা ছিল। বারবার পেজ রিফ্রেশ করা। “এলো? না এখনো না।”
ফ্যান ক্লাব ছিল। কমিউনিটি ছিল। “আমি রাত জাগি” কমিউনিটিতে পঞ্চাশ হাজার মেম্বার — সবাই রাত জাগত শুধু অর্কুট করতে।
অর্কুট মরে গেল। সবাই কাঁদল।
তারপর ফেসবুকে গিয়ে কান্নার স্ট্যাটাস দিল।
তারপর এলো ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ।
এখন যোগাযোগ আরো সহজ হলো।
এত সহজ যে — কেউ আর যোগাযোগ করে না।
গ্রুপ বানানো হলো — “পরিবার”, “বন্ধুরা”, “পাড়ার ছেলেরা।”
গ্রুপে কেউ কথা বলে না। শুধু ফরওয়ার্ড আসে।
সকালে উঠলেই — ফুলের ছবি। “শুভ সকাল 

“
কে পাঠাল? মামা। কেন পাঠাল? জানে না। কী বলতে চাইল? কিচ্ছু না।
এটাই এখন যোগাযোগ।
তারপর এলো ইনস্টাগ্রাম।
এখানে কথা বলা আরো কমে গেল। ছবি দেখা শুরু হলো।
বন্ধু মালদ্বীপ গেছে। ছবি দিয়েছে। তুমি লাইক দিলে। সে তোমার ছবিতে লাইক দিল।
যোগাযোগ সম্পন্ন হলো।
কথা হলো না। কেমন আছ জিজ্ঞেস করা হলো না। কিন্তু তোমরা কানেক্টেড।
এমনকি এখন মানুষ দেখা হলেও কথা বলে না।
“আরে তোর ইনস্টাগ্রাম দেখেছি, গোয়া গিয়েছিলি!” “হ্যাঁ।” “কেমন ছিল?” “ক্যাপশনে লেখা আছে।” 
এবং এখন — ২০২৬।
তুমি এই পোস্টটা পড়লে।
শেষ পর্যন্ত পড়লে।
কিছু একটা অনুভব করলে।
তারপর স্ক্রল করে চলে গেলে।
যোগাযোগের বিবর্তন সম্পন্ন হয়েছে। 

এখন সবাই সব ভুলে যায়